চুক্তি সফল হলে কৃতিত্ব ট্রাম্পের, ব্যর্থ হলে দায় ভ্যান্সের? বিতর্কে ওয়াশিংটন
ইরানের সঙ্গে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও পরমাণু চুক্তি নিয়ে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তবে এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একের পর এক কঠোর মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
সম্প্রতি ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, তাহলে ভ্যান্সের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেওয়া ইরানি প্রতিনিধিদের দেশে ফেরার সুযোগ নাও থাকতে পারে। তাঁর এই মন্তব্য এমন সময় এসেছে, যখন ভ্যান্স তেহরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি ও নতুন পরমাণু চুক্তির ভিত্তি তৈরির চেষ্টা করছেন।
সোমবার ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে ভ্যান্স বলেন, আলোচনার প্রথম ধাপ শান্তির জন্য একটি ‘সফল ভিত্তি’ তৈরি করেছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, আলোচনার পথ সহজ নয়। একদিকে তাঁকে ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে হচ্ছে, অন্যদিকে সামলাতে হচ্ছে নিজ প্রশাসনের কঠোর অবস্থান ও রাজনৈতিক চাপ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ইতোমধ্যে শত্রুতা বন্ধে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছে। দুই পক্ষ আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি দীর্ঘস্থায়ী পরমাণু চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়া সফল না হলে রাজনৈতিক দায় কার ওপর বর্তাবে, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প রসিকতার সুরে বলেছিলেন, চুক্তি সফল হলে কৃতিত্ব তিনি নেবেন, আর ব্যর্থ হলে দায় দেবেন ভ্যান্সকে। যদিও ভ্যান্স বিষয়টিকে ‘মজা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন, তবুও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রশ্নে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের সিনিয়র ফেলো করিম সাদজাদপুর বলেন, ভ্যান্স অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন। শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারলে তিনি রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারেন, আবার চুক্তি বিতর্কিত হলে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
এদিকে আলোচনার বিভিন্ন বিষয় নিয়েও দুই পক্ষের বক্তব্যে দেখা দিয়েছে অসঙ্গতি। ভ্যান্স দাবি করেছেন, ইরান জাতিসংঘের পরমাণু পরিদর্শকদের আমন্ত্রণ জানাতে সম্মত হয়েছে। তবে ইরানি কর্মকর্তারা বলেছেন, এ বিষয়ে তারা নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
একইভাবে ইরানের জন্য সম্ভাব্য অর্থায়ন ও খাদ্য আমদানির বিষয়েও দুই দেশের অবস্থানে পার্থক্য দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব অনুযায়ী, কাতারে আটকে থাকা ইরানের অর্থ ছাড় করা হলে তা দিয়ে মার্কিন কৃষকদের কাছ থেকে খাদ্যপণ্য কেনা হবে। কিন্তু তেহরান জানিয়েছে, তারা ওই অর্থ দেশের অবকাঠামো পুনর্গঠনে ব্যয় করতে চায়।
তবুও ভ্যান্স আশাবাদী। ওয়াশিংটনে ফেরার আগে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে অতিরিক্ত সংশয় না দেখিয়ে বাস্তব পরিস্থিতির দিকে নজর দেওয়া উচিত। তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের বিশ্বাস, আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।’
তবে কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি রাজনৈতিক সমীকরণও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, ট্রাম্প তাঁর ঘনিষ্ঠদের কাছে জানতে চাচ্ছেন, ভ্যান্স ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্ট হওয়ার মতো যোগ্যতা রাখেন কি না। একই সময়ে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে ভ্যান্সের কাজের তুলনাও করছেন।
সব মিলিয়ে ইরান ইস্যু এখন শুধু একটি আন্তর্জাতিক সংকট নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, রিপাবলিকান পার্টির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব এবং ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।






