পশ্চিমবঙ্গে বিক্ষিপ্ত সহিংসতা
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিজেপির জয়ের পরই রাজ্যের একাধিক জায়গায় বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ ও সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কলকাতার নিউ টাউনে মধু মন্ডল নামে এক বিজেপিকর্মী নিহত হয়েছেন। গতকাল সন্ধ্যায় বিজেপির বিজয় মিছিলে তৃণমূল কংগ্রেসকর্মীদের হামলায় তিনি নিহত হন। এদিকে, পশ্চিম বর্ধমান জেলার দুর্গাপুরের মুচিপাড়ায় তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুরের অভিযোগ কেন্দ্র করে সেখানে দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অভিযোগ উঠেছে, দুর্বৃত্তরা তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর চালায়। ঘটনার প্রতিবাদে সার্ভিস রোড অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকরা। পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় ঘটনাস্থলে কেন্দ্রীয় বাহিনী ও পুলিশ পৌঁছে তা নিয়ন্ত্রণে আনে। আসানসোল বাসস্ট্যান্ড এবং গোধূলি মোড়ে তৃণমূলের দুটি দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর করে অগ্নিসংযোগের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায়ও এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে বলে জানা যায়। মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরেও ফলাফল-পরবর্তী সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। এদিন সন্ধ্যায় বহরমপুর থানার চুঁয়াপুর কদমতলা বটতলা এলাকা দিয়ে ডিজে বাজিয়ে বিজেপির বিজয় মিছিল ভাকুড়ি ১ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের উপ-প্রধান বিপ্লব কুন্ডুর বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। তখন বিজেপির বিজয় মিছিলে থাকা ব্যক্তিরা বিপ্লব কুন্ডুর বাড়িতে ভাঙচুর চালায় ও বাড়ির সামনে রাখা বেশ কয়েকটি বাইকে ভাঙচুর চালায় ও পেট্রোল ঢেলে আগুন দেয় বলে অভিযোগ। খবর পেয়ে বহরমপুর থানার পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ইটাহারের জয়ী তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী মোশারফ হোসেনের গাড়িতেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। গণনা কেন্দ্রের ১০০ মিটার পার হতেই এ হামলা হয় বলে জানা গেছে। মালদা জেলার গাজোল বিধানসভা এলাকার চাকনগরে তৃণমূল কংগ্রেসের অঞ্চল সভাপতি ত্রিনাথ বিশ্বাসের বাড়ি ও দোকান ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে বিজেপির কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ, একদল মানুষ হঠাৎ তার বাড়ি ও দোকানে ঢুকে আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ভাঙচুর চালায়। এ ঘটনা কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয় কেন্দ্রীয় বাহিনী।
এমনকি বিজেপি নেতা ও মুখ্যমন্ত্রীর দৌড়ে থাকা শুভেন্দু অধিকারীর বিধানসভার আসন পূর্ব মেদিনীপুর জেলার নন্দীগ্রামেও ফলাফল-পরবর্তী বিশৃঙ্খলা হয়েছে। সদ্যজয়ী বিজেপির বিরুদ্ধে অভিযোগ, তৃণমূলের দলীয় কার্যালয় দখল করে এর ভিতরে থাকা আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়েছে, ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে ফ্লেক, ফেস্টুন, পতাকা। মমতা ব্যানার্জির কুশপুতুল তৈরি করে জুতোর মালা পরিয়ে ‘আইপ্যাকের ফাইল-চোর’ লিখে তা টাঙিয়ে দেওয়া হয়। মধ্য হাওড়ার ডুমুরজলার কাছেও তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় অফিস ভাঙচুর করা হয়, ছিড়ে দেওয়া হয় ব্যানার, ফেস্টুন, চেয়ার, টেবিল। এ ছাড়া দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার গঙ্গারামপুর থানার মহারাজপুর এলাকায় বিজেপির কর্মীদের বিরুদ্ধে এক তৃণমূল নেতাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করার খবর পাওয়া গেছে। আহত তৃণমূল নেতাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পরেশ বসাক নামে ওই নেতা ৩/২ বেলবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার স্থানীয় তৃণমূল নেতা। তবে তৃণমূলের এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে বিজেপি।
এদিকে হামলার অভিযোগ উঠেছে তৃণমূলের বিরুদ্ধেও। দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার ক্যানিংয়ে বিজয় মিছিলে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন এক বিজেপি কর্মী। আহত ওই কর্মীকে উদ্ধার করে ক্যানিং মহকুমা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর কলকাতার চিত্তরঞ্জন ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার ক্যানিং এলাকায় ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেওয়ায় তিন বিজেপি কর্মীকে মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ক্যানিং থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়েছে। পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে তৃণমূল। এদিকে হাই-ভোল্টেজ ভবানীপুর আসনে তৃণমূলের প্রার্থী মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি হেরেছেন তার এক সময়ের বিশ্বস্ত বিজেপির প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে। শুভেন্দুর কাছে ১৫ হাজার ১০৫ ভোটে পরাজিত হয়েছেন মমতা। পূর্ণাঙ্গ অর্থাৎ ২০ রাউন্ড গণনা শেষে শুভেন্দুর প্রাপ্ত ভোট ৭৩ হাজার ৯১৭ ভোট, আর মমতার প্রাপ্ত ভোট ৫৮ হাজার ৮১২ ভোট। তবে এবারই প্রথম নয়, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও এই শুভেন্দুর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন মমতা। দেড় হাজারের ভোটে সেবার পরাজয় স্বীকার করতে হয়েছিল মমতাকে। তবে মমতা হারলেও বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয় পেয়েছিল তার দল। পরবর্তীতে এই ভবানীপুর আসন থেকে উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে তৃতীয়বারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হন মমতা।
পদত্যাগ করবেন না মমতা : বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিজেপির কাছে পরাজিত হলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন মমতা ব্যানার্জি। নির্বাচনে তাঁর দল তৃণমূল কংগ্রেস পরাজিত হয়নি দাবি করে মমতা প্রশ্ন তুলেছেন, কেন তিনি পদত্যাগ করবেন? গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে মমতা বলেন, আমরা হারিনি। আমি পদত্যাগ করব না। আমার রাজভবনে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। সংবাদ সম্মেলনে তাঁর পাশে ছিলেন দলের জ্যেষ্ঠ নেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
পশ্চিমবঙ্গে আগামী ৯ মে রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিন শপথ নিতে পারেন বিজেপির নেতৃত্বাধীন নতুন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু কে হচ্ছেন পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী তা নিয়ে এখন চলছে নানা জল্পনা। বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী দুই আসনে জিতেছেন। আবার আছেন শমীক ভট্টাচার্য যার সভাপতিত্বে নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়েছে বিজেপি। অন্যদিকে ‘রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ’ (আরএসএস)-এর সাবেক প্রচারক দিলীপ ঘোষও রয়েছেন।
দিল্লির রাজনীতিতে বড় হয়ে ওঠা সিনিয়র সাংবাদিক স্বপন দাশগুপ্তের নামও উঠে আসছে সম্ভাব্য তালিকায়। তবে অনেক রাজ্যে একেবারে অচেনা মুখকে মুখ্যমন্ত্রী পদে বসানোর নজিরও রয়েছে বিজেপির ক্ষেত্রে।
তবে মুখ্যমন্ত্রীর দৌড়ে সবার শীর্ষে আছেন শুভেন্দু অধিকারী। এবারের নির্বাচনে দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুর এবং পূর্ব মেদিনীপুর জেলার নন্দীগ্রাম আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন শুভেন্দু। জয় পেয়েছেন ২ আসনেই। অনেকে আবার শুভেন্দুর সঙ্গে এক আসনে বসাতে চাইছেন দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যকে। সামনের সারিতে থেকে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন রাজ্যসভার এই সাংসদ। আর তাতেই বাজিমাত, প্রথমবার পশ্চিমবঙ্গের মসনদে ফুটেছে পদ্ম। যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
মুখ্যমন্ত্রীর দৌড়ে আছেন খড়গপুর সদর আসনে বিজেপির জয়ী প্রার্থী দিলীপ ঘোষও। পশ্চিমবঙ্গে গেরুয়া শিবিরকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন রাজ্যের সাবেক বিজেপি সভাপতি। ২০১৫ থেকে ২০২১ সালের মধ্যবর্তী সময়ে রাজ্যে বিজেপির সম্প্রসারণে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ‘রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ’ (আরএসএস)-এর এই সাবেক প্রচারক। যার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে দলটি লোকসভার ১৮টি আসনে জয়লাভ করে। ওই নির্বাচনে তিনি নিজেও মেদিনীপুর কেন্দ্র থেকে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন। যদিও ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বর্ধমান-দুর্গাপুর আসনে পরাজিত হন তিনি। এরপর থেকে দলে কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়েন তিনি। তবে এবার তার ওপর আস্থা রেখে বিধানসভার নির্বাচনে প্রার্থী করেছিল বিজেপি এবং ফের একবার নিজের নামের প্রতি সুবিচার করলেন দিলীপ। আবার কেউ কেউ বলছেন, রাসবিহারী আসন থেকে জয়ী বিজেপি প্রার্থী স্বপন দাশগুপ্তর ভাগ্যেও শিকে ছিঁড়তে পারে। ফলে যাবতীয় হিসাবনিকাশ উল্টেপাল্টে দিয়ে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কাকে বেছে নেন সেটাই এখন দেখার! কিন্তু বিজেপির নতুন সরকার গঠনের তোড়জোড় শুরু হলেও মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে মমতা ব্যানার্জির পদত্যাগ নিয়ে তৈরি হয়েছে জল্পনা। প্রথা অনুযায়ী, বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা হওয়ার পরই কোনো বিদায়ি মুখ্যমন্ত্রী রাজভবনে গিয়ে রাজ্যপালের হাতে নিজের পদত্যাগপত্র দিয়ে থাকেন। বিদায়ি মুখ্যমন্ত্রী যদি জয়ী হন তবে নতুন করে মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ গ্রহণ করেন। তবে এবার মমতা হেরে গেছেন। ভবানীপুর আসনে পরাজয়ের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও মমতা এখনো নিজের পদত্যাগপত্র পেশ করেননি। ফলে তৈরি হয়েছে গুঞ্জন। বিষয়টি নিয়ে গতকাল সংবাদ সম্মেলন থেকে গণমাধ্যমের এক কর্মীর প্রশ্নের উত্তরে মমতা জানান, ‘কেন? কীসের জন্য? আমরা তো হারিনি যে, রাজভবনে যাব। হারলে আমি যদি শপথ নিতে যেতাম তবে পদত্যাগপত্র জমা দিতাম। ফলে এখন সেই প্রশ্ন উঠছে না। জোর করে দখল করে কেউ যদি মনে করে যে আমাকে গিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দিতে হবে... না, সেটা হবে না। আমি একটা কথা বলতে চাই যে আমরা নির্বাচনে হারিনি। এটা হচ্ছে তাদের জোর করে আমাদের হারানোর একটা প্রচেষ্টা। সরকারিভাবে নির্বাচন কমিশনের মধ্য দিয়ে তারা আমাকে হারাতে পারে। কিন্তু নৈতিকতার দিক থেকে আমি বলতে পারি যে আমরা এই নির্বাচন জিতেছি।’





